শেখ হাসিনাঃ আপনার অপেক্ষাতেই গোটা জাতি

২৩ নভে, ২০০৮ ·

চিকিৎসা শেষে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা যখন দেশ ফিরছেন, ঠিক এর আগেই পীর হাবিব তাকে উদ্দেশ করে লিখলেন। পীর হাবিব তার সর্বশেষ লেখায় আবারো আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে আক্রমণ করেছেন। দীর্ঘ লেখায় তিনি আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে কিছু 'নসিহত'ও করেছেন। এসব একান্তই তার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা। যে কেউ তার নিজস্ব মতামত রাখতেই পারে। কিন্তু একজন পাঠক হিসেবে আমার মধ্যে কিছু প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে। তাই এই লেখার অবতারণা।

পশ্চিমবাংলার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থেকে বিদায় নেয়ার সময় তার কমরেডদের উদ্দেশে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ঐ ভাষণে তিনি বলেছিলেন, 'আপনাদের পৰে-বিপৰে নেতারা কী বলেছে তা নিজ কানে শুনুন। অন্যের কাছ থেকে আপনার সমালোচনা কিংবা প্রশংসা কোনোটাই বিশ্বাস করবেন না।' পীর তার লেখায় বলেছেন, তিনি শুনেছেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তার উপর ৰুব্ধ। এটা শুনেছেন কাদের কাছে যারা আড়ালে তাকে বাহ্বা দেয়। এর মানে ঐ লোকগুলো মন্দ লোক। তাদের কথাতেই এক দীর্ঘ লেখা লিখে ফেললেন পীর?

ওয়ান ইলেভেনের পর শুধু পীর হাবিব কেন, অনেক রথি-মহারথিরা আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর বিরুদ্ধে লিখেছেন। স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল একটি মহল '৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকেই গণমাধ্যমে শেখ হাসিনাকে আক্রমণ করে আসছে। মিথ্যা, অসত্য রিপোর্ট, প্রতিবেদন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যত হয়েছে, পৃথিবীর কোনো দেশে, কোনো জাতীয় নেতার বিরুদ্ধে তা হয়নি। '৯১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর দেশের অনেক বরেণ্য বুদ্ধিজীবী শেখ হাসিনার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে এতটুকু কার্পণ্য করেনি। '৯৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর তারা অনেকেই নেত্রীর কাছে গেছেন, তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছেন। শেখ হাসিনা তাদের সামান্য ভর্ৎসনা করেছেন এমন রেকর্ড নেই। আমার বিশ্বাস, শিগগিরই পীর হাবিবও তার ভুল বুঝতে পারবেন। কারণ, আমি তার লেখার পরিবর্তন লৰ্য করছি। বহু লোক বঙ্গবন্ধু কন্যাকে নানাভাবে বিপদে ফেলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আবার ফিরে এসেছে। শেখ হাসিনা তাদের প্রতি কখনো ৰোভ বা প্রতিহিংসা দেখাননি। বঙ্গবন্ধুর রক্তে ৰোভ, প্রতিহিংসা নেই। তা থাকলে, শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় '৭৫-এর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার প্রচলিত আইনে হতো না। শেখ হাসিনা প্রতিহিংসার রাজনীতি করলে ফারুক রশীদের ক্রসফায়ার হতো। শেখ হাসিনার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বিরল গুণগুলোর একটি বেশি তীব্র, তা হলো ৰমা। আর পীর আপনি কেন, গত ৩৩ বছর একশ্রেণীর গণমাধ্যম দ্বারা শেখ হাসিনা যে পরিমাণ অপসাংবাদিকতার শিকার হয়েছেন তাতে যদি প্রতিক্রিয়া দেখাতেন, তাহলে তিনি রাজনীতি করতে পারতেন না।

পীর হাবিবের লেখার সমস্যা হলো, তিনি সবকিছু খণ্ডিতভাবে দেখেন। যার ফলে যেকোনো জিনিসের একটি অবিকৃত চিত্র ও তথ্য তার লেখায় অনুপস্থিত থাকে। মোহিত লাল মজুমদার কেবল রবীন্দ্র সমালোচক ছিলেন না একজন রবীন্দ্র ভক্তও ছিলেন। মোহিত লাল রবি ঠাকুরের প্রশংসা করে যত কথা লিখেছেন, তেমন শক্তিশালীভাবে আর কজন লিখেছেন?

আপনি আবার দুই নেত্রীর ব্যর্থতার কথা বলছেন। ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, 'একজন রাজনৈতিক নেতা সফল না ব্যর্থ সে সিদ্ধান্ত দেবে জনগণ, নাগরিকগণ। একজন নেতাকে যদি জনগণ প্রত্যাখ্যান করে তাহলে তিনি ব্যর্থ আর জনগণ যদি তাকে সমর্থন করে তাহলে তিনি সফল।' আসুন এই তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে দেখি বঙ্গবন্ধু কন্যা সফল না ব্যর্থ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ '৯১-এর নির্বাচনে সরকার গঠন করতে পারেনি, কিন্তু ভোট পেয়েছিল বিএনপির চেয়ে বেশি। '৯৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগে ৩৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির কথা বলা হলেও বাস্তবে '৯৬-এর চেয়ে তিন শতাংশ বেশি ভোট পায় দলটি (৪০ দশমিক ৮৬ শতাংশ)। তাই জনসমর্থনের মাপকাঠিতে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সফলতম নেতা। প্রতিটি নির্বাচনে তার এবং তার দলের সমর্থন বেড়েছে।

পীর হাবিব তার লেখার দ্বিতীয় অংশে নাম ধরে কিছু ব্যক্তির প্রশংসা করেছেন, নাম ধরে কাউকে সমালোচনা করেছেন। আমি তাদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার ব্যক্তিগত বিতর্কে যাব না। ক্লিনটন যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন তখন, তার কিছু কিছু নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। ল্যারি কিং লাইভে এসে ক্লিনটন, এই সমালোচনার জবাব দিয়েছিলেন এভাবে, 'দেখুন দলটা আমার, আমি তাদের নিয়েই দল গড়েছি যাদের সঙ্গে কাজ করতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমি যখন দল চালাব তখন আমার মতোই লোক বাছাই করতে দিন। আপনারা দিনের শেষে দেখুন দলটা ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা।' তাই দোহাই লাগে, কে ভালো কে খারাপ, কে আপনার পছন্দের, কে আপনার বিপৰের সেই বিতর্ক আনবেন না। আপনার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া, পছন্দ-আনন্দ জাতীয় নেতার উপর চাপানোর চেষ্টা করবেন না। শেখ হাসিনা যার সঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন তাকে নিয়েই কাজ করতে দিন। তিনি যেখানে আছেন, তার থেকে আমার আপনার দূরত্ব যোজন যোজন। তাই আপনার ভাবনার সঙ্গে তার ভাবনা না মিললেই তিনি ব্যর্থ একরম অর্থহীন-যুক্তিহীন কথা না বলাই ভালো। দেখতে হবে, আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে দেয়া অঙ্গীকারগুলো পূরণ করছে কিনা, নীতি আদর্শে অটল আছে কিনা। পীর আপনার লেখাতেই আপনি ব্যক্তি বন্দনার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, আবার আপনিই কয়েকজনকে 'সার্টিফিকেট' দিচ্ছেন, তাদের বন্দনা করছেন। এটা কি স্ববিরোধী হলো না?

আপনি বলছেন তৃণমূলের ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা, আপনিই আবার নাম বলে দিচ্ছেন কাকে কাকে মনোনয়ন দিতে হবে। কী আশ্চর্য কথা! শুধু সাংসদ নয়, মন্ত্রিসভায় কাদের নেয়া উচিত আপনি সে পরামর্শও দিয়েছেন। বা! কী অদ্ভুত। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সরকার কে চালাবেন আপনি না শেখ হাসিনা? ম্যানচেস্টার ইউনিয়ন শুধু ইংল্যান্ডে নয়, সারা বিশ্বে ফুটবলের জনপ্রিয় ক্লাব। এই ক্লাবের কোচ স্যার আলেক্স ফাগুন, কবছর আগে তাদের দামি তারকা ডেভিড বেকহ্যামকে বাদ দেন। শুধু ইংল্যান্ড নয়, বিশ্বব্যাপী এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়, বেকহ্যাম ভক্তরা ৰোভে ফেটে পড়ে। ফাগুন বলেন, 'দল ১১ জন গোলরৰক দিয়ে যেমন চালানো যায় না, তেমনি ১১ জন স্টার (তারকা) দিয়েও চালানো যায় না।' পীর হাবিব মন্ত্রিসভাটাও এরকম। আপনি নিশ্চয়ই মানবেন যিনি প্রধানমন্ত্রীর হট সিটে বসেন তাকে অনেক কিছু একসঙ্গে মাথায় নিয়ে কাজ করতে হয়। তাকে কার্যকর এবং উপযোগী একটা টিম বানাতে হয়।

আপনার আমার চেয়ে শেখ হাসিনা অনেক প্রাজ্ঞ, বিচক্ষণ। তার নেতৃত্ব প্রশ্নাতীত। তাই এসব মাইনর ডিটেইলে না গিয়ে আসুন না আমরা প্রত্যাশা করি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি সেকুল্যার বাংলাদেশ। যে দেশে দারিদ্র্য, সন্ত্রাস থাকবে না, দুর্নীতির কারণে উন্নয়ন বঞ্চিত হবে না দেশের মানুষ। আসুন না আমরা সবাই মিলে, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার করে এই বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করি। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় শেষ ভাষণে বলেছিলেন 'ক্ষুধা দারিদ্র্য মুক্ত, সন্ত্রাস দুর্নীতিমুক্ত একটি গর্বিত বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীতে।' আসুন না আমরা সবাই মিলে সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশের জন্য কাজ করি। পীর অনেক তো সমালোচনা হলো, একবার বলুন না, শেখ হাসিনা একমাত্র আপনিই পারেন এমন এক স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে। কারণ আপনি বঙ্গবন্ধু কন্যা। একবার বলুন না, বঙ্গবন্ধুর রক্ত আপনার ধমনিতে তাই, আজ জাতির এই ক্রান্তিকালে আপনার অপেক্ষাতেই গোটা জাতি।

সৈয়দ বোরহান কবীর
নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

এই ব্লগে..

বাংলাদেশ: মানুষ, প্রেম, স্বাধীনতা, রাজনীতি, দারিদ্রতা আর সম্ভাবনার দেশ। সে দেশের কিছু বিষয়...মনের গভীরে আকি-বুকি কাটা ঘটনা আর অবসরের হাবিজাবি নিয়ে আমার এই ব্লগ।

যেকোন বিষয় নিয়ে মেইল করতে পারেন: bdidol@জিমেইল.কম

সাম্প্রতিক পোষ্ট

সামহ্যোয়ার ব্লগ পোষ্ট